নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার খিদিরপুর ইউনিয়ন পরিষদ আজ এক গভীর প্রশাসনিক সংকটে নিমজ্জিত। দীর্ঘদিন ধরে চেয়ারম্যান ও সচিব—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৌলিক সেবা কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার এই প্রাথমিক স্তম্ভটি যখন অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন তার অভিঘাত সরাসরি পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে—যা বর্তমানে খিদিরপুরবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।
একটি ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম সচল রাখতে চেয়ারম্যান ও সচিবের ভূমিকা পরিপূরক ও অপরিহার্য। চেয়ারম্যান যেখানে নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন, সেখানে সচিব নিশ্চিত করেন প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও নথিপত্র ব্যবস্থাপনা। এই দুই স্তম্ভ একসঙ্গে অনুপস্থিত থাকলে যে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়, খিদিরপুর ইউনিয়ন তার বাস্তব উদাহরণ। জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ কিংবা বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্রের মতো মৌলিক সেবার জন্য মানুষের দিনের পর দিন ঘুরতে হওয়া শুধু দুর্ভোগই নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার একটি বড় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
এই সংকটের পেছনে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ। গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট তৎকালীন চেয়ারম্যান কাউছার রশিদ বিপ্লব পুলিশ কর্তৃক আটক হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৪ সেপ্টেম্বর মনোহরদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে ইউনিয়নের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরই সচিব প্রভাত চন্দ্র দেব হঠাৎ অনুপস্থিত হয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফলে প্রশাসনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে এবং সেবাপ্রদান প্রক্রিয়া হয়ে পড়ে টালমাটাল।
বর্তমানে প্রশাসক নিয়োজিত থাকলেও একাধিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার কারণে তিনি এই ইউনিয়নের সার্বিক সেবা নিশ্চিত করতে পারছেন না—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এতে করে জনগণের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। একটি ইউনিয়ন পরিষদ কেবল প্রশাসনিক কার্যালয় নয়; এটি গ্রামীণ মানুষের রাষ্ট্রীয় সেবার সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষই।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্থবির প্রশাসনিক সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান সম্ভব। খিদিরপুর ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও এই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো প্রয়োজন—অবিলম্বে নির্বাচন আয়োজন করে একটি স্থায়ী চেয়ারম্যান নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক একজন সচিব পদায়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য বিকল্প ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনগণের ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগও সমানভাবে জরুরি।
স্থানীয় সরকার তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়। খিদিরপুর ইউনিয়নের বর্তমান বাস্তবতা সেই কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। এখন আর দেরির সুযোগ নেই—প্রয়োজন দ্রুত, কার্যকর এবং জনবান্ধব সিদ্ধান্ত। কারণ, একটি ইউনিয়নের অচলাবস্থা শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি হাজারো মানুষের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার নাম।





