টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ফসলের ক্ষয়ক্ষতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেবে সরকার। এ লক্ষ্যে হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলা কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জমির পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রশাসনের কাছে তালিকা জমা দিয়েছে। তবে তালিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক কৃষক। তাঁদের অভিযোগ, ফসল হারিয়েও অনেকের নাম তালিকায় ওঠেনি। আবার যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের ক্ষতির পরিমাণ বাস্তবের তুলনায় কম দেখানো হয়েছে।
গত রোববার উপজেলার ১ নম্বর লাখাই ইউনিয়নের স্বজন গ্রামে গিয়ে একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া যায়।
স্বজন গ্রামের কৃষক কালা মিয়া বলেন, তাঁর ১০ কানি জমির মধ্যে চার কানি পানিতে তলিয়ে গেছে। যে ধান কেটে ঘরে তুলেছেন, তারও অর্ধেকের বেশি নষ্ট হয়েছে। কৃষক আনজব আলী বলেন, তাঁর ১৬ কানি জমির মধ্যে আট কানি সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। দিন ইসলাম নামের আরেক কৃষকের ছয় কানি জমি পানিতে তলিয়ে গেলেও তালিকায় তাঁর নাম শেষের দিকে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সৈয়দ পাঠান, খোকন মিয়া, শাহ আলমের স্ত্রী ও জাহাঙ্গীর মওয়াসহ প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম তালিকায় নেই। তাঁদের ভাষ্য, সপ্তাহখানেক আগে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কামাল মিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এসে জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর দিয়ে অনলাইনে আবেদন করতে বলেন। এ সময় কিছু কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্রও সংগ্রহ করা হয়।
কৃষকদের অভিযোগ, এলাকার কয়েকটি হাওরের বিস্তীর্ণ জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেকে ধান কাটতেই পারেননি। আবার কেউ ধান কেটে আনলেও অতিবৃষ্টির কারণে খলায় ধান পচে গেছে।
কৃষক দিলাল মিয়া বলেন, “যাদের এক কানিও জমি নেই, তারাও আবেদন করেছে।”
স্থানীয় কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, প্রকৃত কৃষকদের পাশাপাশি এমন কিছু ব্যক্তিও আবেদন করেছেন, যাঁদের কোনো কৃষিজমি নেই। এতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তা পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন।
লাখাই প্রেসক্লাবের সভাপতি বাহার উদ্দিন বলেন, “কৃষকেরা তখন হাওরে ধান নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আর যাঁদের জমি নেই, তাঁরা আবেদন নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন।”
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, লাখাই উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ১১ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। আবার কেউ ধান কেটে আনলেও অতিরিক্ত বৃষ্টিতে তা নষ্ট হয়েছে।
তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে লাখাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তফা কামাল খরছু বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত নন—এমন অনেকের নাম তালিকায় এসেছে। আবার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম বাদ পড়েছে।”
এ বিষয়ে লাখাই ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কামাল মিয়া বলেন, “খুব অল্প সময়ের মধ্যে আবেদন নিতে হয়েছে। ১ নম্বর ইউনিয়ন থেকে ৮৫০ জন কৃষকের তালিকা নেওয়ার কথা থাকলেও আবেদন করেছেন প্রায় ২ হাজার ৬০০ জন। তাই অনেকেই বাদ পড়বেন।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদুল ইসলামের কাছে জমি না থাকা ব্যক্তিদের আবেদন করার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তালিকা নিয়ে ইউএনওর সঙ্গে আলোচনা করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “যখন জমি তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন অনেক মানুষ বাজারে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁরা যদি ধান কাটায় সহযোগিতা করতেন, তাহলে এত জমি পানিতে তলিয়ে যেত না।”




