হারারের গরম বিকেল। শহরের ব্যস্ত রাস্তার ভিড়ের ভেতর দিয়ে চলেছে কালো কাচঢাকা বিলাসবহুল এক গাড়ি। গাড়ির ভেতরে বসা মানুষটি কেবল রাষ্ট্রদূত নন—তিনি দেশের প্রেসিডেন্টের আস্থাভাজন, প্রভাবশালী পাদ্রি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের দূত ইউবার্ট অ্যাঞ্জেল। তাঁর মুখে প্রশস্ত হাসি, পাশে বসা ডেপুটি রিকি ডুলানের ঠোঁটের কোণে রহস্যময় বাঁক। ঠিক যেন দু’জন এমন কিছু বলতে যাচ্ছেন, যা সাধারণ কূটনীতির বাইরে।
“এটা একদম পারফেক্ট ওয়াশিং মেশিন,” হাসতে হাসতে বলেন ডুলান। আল জাজিরার আন্ডারকভার সাংবাদিকদের উদ্দেশে দেওয়া সেই প্রস্তাব ছিল চমকপ্রদ—কূটনৈতিক মর্যাদার আড়ালে অবৈধ অর্থ দেশে এনে তা স্বর্ণে রূপান্তর, পরে সেই স্বর্ণ বিক্রি করে ফেরত দেওয়া হবে একদম পরিষ্কার, বৈধ অর্থ হিসেবে।
জিম্বাবুয়ের এই চোরাচালানের গল্প শুধু কিছু অপরাধী বা ব্যবসায়ীর নয়—এটি এক আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, যেখানে মিলেমিশে গেছে রাজনীতি, বাণিজ্য, কূটনীতি আর অপরাধ। আল জাজিরার চার পর্বের অনুসন্ধানী সিরিজ গোল্ড মাফিয়া তিন মহাদেশজুড়ে আড়াল ভেঙে দেখিয়েছে, কীভাবে জিম্বাবুয়ে থেকে প্রতি মাসে বিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের স্বর্ণ পাচার হয়ে যায় দুবাইয়ে, আর সেই পথে ধোয়া হয় বিশ্বের বিভিন্ন কোণ থেকে আসা কালো টাকা।
প্রক্রিয়াটা বেমানানভাবে সহজ। বিদেশি অপরাধীরা, যাদের হাতে বিশাল অংকের অবৈধ নগদ রয়েছে, সেই টাকা তুলে দেয় জিম্বাবুয়ের পাচার নেটওয়ার্কের হাতে। দেশের নিজস্ব মুদ্রা আন্তর্জাতিকভাবে মূল্যহীন হয়ে পড়েছে বহু আগেই—তাই সরকার মরিয়া মার্কিন ডলারের জন্য। পাচারকারীরা সেই নগদ ব্যবহার করে স্থানীয় স্বর্ণ কেনে, তারপর তা বৈধ পথে রপ্তানি করে। বিক্রির আয় পাঠানো হয় ক্রেতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, আর নগদ ফিরে আসে জিম্বাবুয়ের কোষাগারে।
এই গোপন খেলায় অংশ নেওয়া বড় বড় চরিত্রদের একজন কামলেশ পাতনি। ৯০-এর দশকে কেনিয়ার অর্থনীতি কাঁপিয়ে দেওয়া স্বর্ণ কেলেঙ্কারিতে তাঁর নাম এসেছিল। সেই সময় অভিযোগ ছিল—রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে শত শত মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছেন তিনি। আইনে দোষী সাব্যস্ত না হলেও, আল জাজিরার গোপন ক্যামেরা তাঁকে ধরেছে নতুন ব্যবসায়—জিম্বাবুয়ে থেকে দুবাইয়ে স্বর্ণ পাচার, সেখানে বিক্রি করে অর্থ সাদা করা।
পাতনির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইওয়ান ম্যাকমিলান। তাঁর কার্যক্রমও সমান বিস্তৃত। সপ্তাহে কয়েকশ কেজি স্বর্ণ কুরিয়ারের মাধ্যমে পৌঁছে যায় দুবাইয়ে, যেখানে অপেক্ষা করে অ্যালিস্টার ম্যাথিয়াস—অর্থ সাদা করার এক বিশেষজ্ঞ। শেল কোম্পানি, ভুয়া বিল আর ব্যাংক লেনদেনের জটিল খেলার মধ্য দিয়ে বদলে যায় অর্থের পরিচয়, ঠিক যেমন স্বর্ণ গলিয়ে নতুন আকার দেওয়া হয়।
এই বৃত্তে আছেন আরও একজন ধনকুবের—সাইমন রাডল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার কালোবাজারে সবচেয়ে জনপ্রিয় সিগারেট ব্র্যান্ড গোল্ড লিফ টোব্যাকোর মালিক। অভিযোগ, তাঁর কোম্পানি জিম্বাবুয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে অর্থপাচারের আরেকটি পথ খুলে দিয়েছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই পাচারকারীদের হাতে রয়েছে জিম্বাবুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈধ লাইসেন্স—যা দিয়ে তারা আইনগতভাবেই দুবাইয়ে স্বর্ণ বিক্রি করতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী বিক্রির আয় ফেরত আসার কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে, কিন্তু বাস্তবে সেটি ঘুরে যায় বিদেশি শেল কোম্পানির অ্যাকাউন্টে। নগদ ফিরিয়ে আনা হয় জিম্বাবুয়েতে, যাতে সব কিছুর রেকর্ড দেখতে ‘একদম পরিষ্কার’ লাগে।
প্রতিবেদনের সব চরিত্রই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পাতনি বলেন, তিনি ভেবেছিলেন বিনিয়োগকারীরা হোটেল ব্যবসায় আগ্রহী। ম্যাথিয়াস দাবি করেন, তিনি কখনো অর্থপাচারের কাঠামো তৈরি করেননি, অবৈধ স্বর্ণ বেচাকেনাও করেননি। রাডল্যান্ড অভিযোগগুলোকে বলেছেন ‘ষড়যন্ত্র’ এবং ‘হিংসা’। গোল্ড লিফ টোব্যাকোও যেকোনো অবৈধ ব্যবসায় জড়িত থাকার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।
জিম্বাবুয়ের রিজার্ভ ব্যাংক বলেছে, তারা অর্থপাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ম্নানগাগোয়া, অ্যাঞ্জেল, ডুলান, রুশোয়া—কারোর কাছ থেকেই আল জাজিরা কোনো উত্তর পায়নি।
স্বর্ণ—যা একসময় ছিল সৌন্দর্য ও সম্পদের প্রতীক—এখন জিম্বাবুয়ের জন্য এক গোপন বাঁচনোর পথ, আবার একই সঙ্গে ধ্বংসের ফাঁদও।




