ওমর ফারুক
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দরিদ্র এবং জমিদার কর্তৃক নিষ্পেষিত বাঙালি কৃষক মুসলমানদের মুক্তির দিন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ বর্তমান বাংলাদেশ নামক মুসলিম জনপদের জন্য এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথের মত জমিদারদের জমির মালিকানা প্রজা এবং অশিক্ষিত মুসলিম কৃষকদের হাতে চলে যাচ্ছে বলে আমার সোনার বাংলার মত গীত লিখতে হয়। অবশ্য এ দায় শুধু রবীন্দ্রনাথের উপর দিলে কিছুটা অবিচার হবে বলেই মনে করছি। মুসলিম আশরাফ আর জমিদারীর মালিক গজনভীরাও এই কাজে কম যাননি। ফলে অশিক্ষিত দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের আর মুক্তি মেলেনি।
সাহিত্যালাপে চোখ রাখলে আমরা হতচকিত নয়নে আশ্চর্যবোধের উৎকণ্ঠায় মুসলিম সমাজ জীবনকে গড় হাজির পাই। ফলে, আমাদের অবচেতন মন প্রশ্ন তোলে তুমি কি আসলেই বাংলাদেশের মানুষ!! এই চিন্তা আমাদেরকে এগিয়ে নেয় ৪৭ এর মুক্তির দিকে। ৪৭ কে ঠেকানোর জন্য কেউ ই কম কোশেশ করেনি। কিন্তু পল্লী বাংলার নিপীড়িত দরিদ্র কৃষক শ্রেণিকে ভোটের অধিকারে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগ ৪৭কে স্বরূপ দান করে। এখানে আমরা যেহেতু বাংলা নিয়ে কথা বলছি সে জায়গা থেকে এটাও আলোচনা করা জরুরি যে, ৪৭এ দেশ ভাগের মূল ও একমাত্র কারণ ছিল মুসলিমদের অধিকার ও অবদানের স্বীকৃতি আদায় করা।
আবুল মনসুর আহমদ বলছেন, “বাঙালি হিন্দুরা বাংলায় মেজরিটি শাসন ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন উভয়টারই বিরোধী ছিলেন।“ অর্থাৎ বাংলায় যদি মেজরিটি শাসন প্রতিষ্ঠা হয় তাহলে তো তা অচ্ছুত মুসলিমদের হাতে চলে যাবে। তাই এর বিরোধিতা হিন্দু জমিদাররা করতে বাধ্য ছিল। কিন্তু মুশকিল হলো এরা এর আগে নিজেদেরকে উজাড় করে দিয়ে “ ‘বাঙালি জাতিত্ব’ ‘বাংলার কৃষ্টি’ ‘বাংলার বিশিষ্ট’ ‘বাংলার স্বাতন্ত্র্য’ প্রচার করিতেন। অনেকে বিশ্বাসও করিতেন। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় ভোটাধিকার প্রসারে বাংলার রাষ্ট্রীয় অধিকার মেজরিটি মুসলমানের হাতে চলিয়া যাইবে এটা যেদিন পরিষ্কার হইয়া গেল, সেই দিন হইতেই হিন্দুর মুখে বাঙালি জাতিত্বের কথা, বাংলার কৃষ্টির কথা আর শোনা গেল না।”
বাংলার মূল ত্রাতা ও ছিলো ব্রাহ্মণ জমিদার পরিবার এবং উচ্চ হিন্দু শ্রেণী তাও আসলে আমরা আবুল মনসুর আহমদের লেখায় পাই। এটার জন্য আমি অবশ্য হিন্দুদের দোষ দিতে পারি না। কারণ, সুলতানী বাংলার পরে বাংলাকে মোঘলরা কলোনী ঘোষণা করে এবং বাংলার অর্থনীতিকে উচ্চগামী করার নাম করে মুসলিম শায়খ, মাখদূম ও সূফিদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিয়ে হিন্দুদেরকে প্রদান করে। রিচার্ড এম ইটন তার দি রাইজ অব ইসলাম এন্ড দি বেঙ্গল ফ্রন্ট ইয়ারে ব্যাপারটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। হিন্দুদেরকে জমি বরাদ্দের মূল কারণ ছিল সুবেদাররা হিন্দুদের থেকে বেশী পরিমাণ খাজনা আদায় করতে পারতো। ফলে বৃটিশরা যখন দেশ দখল করলো তখন হিন্দু-মুসলিম প্রশ্নকে প্রকট আকারে হাজির করার মধ্য দিয়ে হিন্দুদেরকে আরো শক্তিশালী করলো এবং বাংলার মুসলিমরা আরো বেশী নিপীড়িত হইতে থাকলো। বৃটিশ সময়ে মুসলিমদের অবস্থা আচ করার জন্য হাজী শরীয়ত উল্লাহ রহঃ কে পড়লেই আমরা বিষয়টা পরিস্কারভাবে উপলদ্ধি করতে পারবো। শুধু এতটুকু আচ দেয়া যেতে পারে যে, ঐ সময় প্রজা মুসলমানকে অন্তত চার-পাচ ধরনের খাজনা দিতে হইতো জমির ফসলের বাইরে। এগুলোকে শ্রাদ্ধ খরচ, পৈতা খরচ, রথ খরচ এবং দূর্গা ভৃত্থী হিসেবে দিতে হইতো।
আবুল মনসুর আহমদ বলছেন, ১৯৩৩-৩৪ সালে একবার বন্যা হইলো এবং রিলিফ উঠানোর জন্য আমরা রিলিফ কমিটি বানাইলাম। রিলিফ উঠানোর পর “তহবিলের টাকা বণ্টনের এক সভায় সমিতির প্রেসিডেন্ট রায় বাহাদুর শশধর ঘোষের সাথে আমার তর্ক বাধে। তিনি আমাকে স্মরণ করাইয়া দেন যে চাঁদাদাতারা প্রায় সবাই হিন্দু। আর যায় কোথায়? আমি গর্জিয়া উঠিলাম। আমার হাজার-বার-কওয়া ঐসব কথা মুখস্থ বলিয়া গেলাম এবং উপসংহার করিলামঃ ‘অতএব বাংলার দাতা হিন্দু ভিক্ষুক মুসলমান।‘ রায় বাহাদুর ও সমবেত মেম্বরদের আমি স্মরণ করাইয়া দিলাম বাংলার হিন্দুদের যার ঘরে যত টাকা আছে সব মুসলমানের।“
কেন বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য রবীন্দ্রনাথের মত লোকেরা আঁট ঘাট বেধে নেমেছিল আমরা সেটা অন্তত আবুল মনসুর আহমদ থেকে বুঝতে পারি।
জয়া চ্যাটার্জী তার বাংলা ভাগ হলো বইয়ে একটা টার্মিনোলজি ব্যাবহার করেছেন সেটা হইলো “ভদ্রলোক”। ভদ্রলোক সমাজের পরিচয় দিতে গিয়ে উনি বলছেন, এরা মূলত সামন্ত বা জমিদার শ্রেনীর লোক। ভদ্রলোক সমাজ ১৯৩০-১৯৪৭ পর্যন্ত পুরোটা সময় সম্মিলিত বাংলার জন্য কথা বলেছেন। অবশ্য উনি এর জন্য একটা কারণই উল্লেখ করেছেন আর সেটা হলো বর্তমান বাংলাদেশ ছিল তাদের জমিদারী আর কলকাতা ছিল তাদের বাসের স্থান। বাংলার মুসলিম কৃষক কর্তৃক উতপাদিত ধানের মূল মূলধনটা উনারা কলকাতায় বসেই ভোগ করতেন আর যখন সুদ দেয়ার সময় হতো তখনি রবীন্দ্রনাথ কিংবা প্রফুল্ল চন্দ্ররা বাংলার কাদা-মাটি-জল মাড়াতেন। তবে এই বিচ্ছিরি কাদা-মাটি-জলই মূলত তাদের কলকাতার আয়েশী জীবনের একমাত্র উপায় ছিল।
মুশকিল হইলো আমাদের বর্তমান প্রজন্ম ইতিহাস ঘেটে দেখে না। ফলে, আমাদের এখানে কলকাতার বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ানটা আসলে কি সেটার ব্যাপারে জাহালত তাদেরকে মূলে ফিরে যেতে দেয় না। জয়া বলছেন, “ বর্তমান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা ১৯২৬ সালে হিন্দুসভা সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। এতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে যুক্তি দেখানো হয় যে, হিন্দু-মুসলমান ঐক্যর জাতীয় প্রত্যাশা একটা অলস ও অকার্যকর স্বপ্ন।“ অথচ বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদেরকে শেখায় এই ঐক্য মূলত মুসলিমরা ধরে রাখতে চায়নি।
মুসলিমরা অদপতিত জাতি এবং অশিক্ষিত অচ্ছুত হিসেবে তাদেরকে ৪৭ভাগ সিট বণ্টন করার নীতি রোয়েদাদের ব্যাপারে ছিল হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেনীর চরম অসন্তোষ। আমরা যদি চ্যাটার্জীর টেক্সটে চোখ রাখি তাহলে ব্যাপারটা আরো পরিস্কারভাবে বুঝতে সক্ষম হবো। চ্যাটার্জী বলছেন, “ শরৎচন্দ্র এ কথা গ্রহণ করার আন্তরিক আহবান জানান যে, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা পুনর্মিলনের অযোগ্য। তিনি বলেন, এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার পার্থক্যের মূল বিষয় হল ‘সংস্কৃতি’। এই কথা ও শিল্প-সাহিত্যের মধ্য দিয়ে হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেনী তার প্রজা অশিক্ষিত এবং অচ্ছুত মুসলমানদের অপরায়ন করে যাচ্ছিল। কিন্তু বাংলা ভাগের দায়টা গিয়ে পরলো মুসলমানদের উপর। ৫২ এর পর থেকে নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশে আমরা মুসলিমরা যে এখনো সংস্কৃতিবান হয়ে উঠতে পারিনি সেটা এখনো শান্তি নিকেতন আমাদেরকে সবক দিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরকে সংস্কৃতিবান হয়ে উঠার জন্য চ্যাটার্জীর সেই ভদ্রলোকের তথা পশ্চিম বঙ্গের প্রজা হয়ে থাকা জরুরি।
আজকের আজাদী দিবসে বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলাপের এই পর্যায়ে মুসলিমদের আন্দোলন সংগ্রামের পর্যায়টা আমরা আবার আবুল মনসুর থেকে বুঝার কোশেশ করবো। আবুল মনসুর বলছেন, “ঐতিহাসিক যত কারণ ও পারিপার্শ্বিক যত যুক্তিই থাকুক না কেন, এই যুগের বাস্তব অবস্থা ছিল এই যে মুসলমানরা সাধারণভাবে ও শিক্ষিত সম্প্রদায় বিশেষভাবে নিজেদের মাতৃভূমিকে আপন দেশ মনে করিত না। তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কামে-কাজে এটা মনে হওয়া মোটেই অযৌক্তিক ছিল না যে মুসলমানরা নিজ দেশের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলিকেই বেশি আপন মনে করে। প্রথমতঃ মুসলমানদের কোনও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক চিন্তা-ধারা ছিল না। যদি কিছু থাকিয়া থাকে সেটা ছিল প্যানইসলামিযম। ‘মুসলিম হায় হাম সারা জাহা হামরা’ই যেন ছিল তাদের সত্যকার রাষ্ট্র-দর্শন।“
সাহিত্য ও ইতিহাস পর্যালোচনায় আমরা এ সকল ব্যাপারগুলোই লক্ষ্য করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কলকাতার বাবুদের বিরোধীতার সম্মুখীন হলেও নবাবরা মূলত তাদের নবাবী মর্যাদা টেকানো ও ঠেকানোর জন্যই শেষমেষ তা করে। বাংলার খেটে খাওয়া দরিদ্র কৃষক মুসলিমদের ব্যাপার নিয়ে আশরাফ শ্রেনীর কোন মাথাব্যথা ছিল না। বরং তাদের আত্মসম্মান বাঁচানোর তাগিদে তারা কলকাতার বিরোধে নামে। আগেই আমরা দেখেছি ময়মনসিংহের গজনভীরা নিজেদের জমিদারী বাঁচাতে হিন্দু ভদ্রলোকদের সাথেই যোগ দিয়েছিল। তবে বাংলার দরিদ্র মুসলিমদের জন্য এখানকার উচ্চবংশীয় সোহরাওয়ার্দী এবং ফজলুল হকরা অসামান্য অবদান রেখেছেন। আবুল মনসুর আহমদরাই আমাদের জনপদকে পথ দেখিয়েছেন মুসলিম অধিকার ও অবদানের স্বীকৃতি আদায়ে।
পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয় আল্লামা ইকবালকে কিন্তু ইকবাল যে পাকিস্তানের মানচিত্র একেছিল তার পাকিস্তানে বাংলাদেশ বা পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান ছিল না। অথচ, পুরো ভারত উপমহাদেশের ১৮৭২ সালের আদম শুমারি সবাইকে জানান দেয় আমরা এই দরিদ্র কৃষক মুসলিমরাই ছিলাম উপমহাদেশের একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনপদ। ঠিক এই বিষয়টিই আমাদের ভাবনার দুয়ার খুলে দেয় যে ইকবালের মত আশরাফ মুসলিমরা আমাদের মত দরিদ্র মুসলিমদের তাদের পবিত্র রাষ্ট্রে ধারণ করতে হয় লজ্জাবোধ করতেন নয়তো আমাদেরকেও অপবিত্রই মনে করতেন। অথচ, এই বঙ্গের মানুষদের চাওয়ার ফলেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। মুসলিম লীগের জয় যে আমাদের সাথে লিয়াজু করেই হইছে তার ব্যাপারে ইতিহাস তো তার সত্যকে নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়।
গ্রাম-বাংলার কাদা-মাটি-পানির দরিদ্র কৃষক মুসলিমদের ভোটেই যে পাকিস্তানের সৃষ্টি সে পাকিস্তান আমাদেরকে দমিয়ে রাখার জন্য বৈষম্যের নহর বহিয়ে দেয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দুর কথা বলে এবং সে কলকাতার কমিউনিস্ট আধিপত্যের বয়ান করে যায়। কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় হইলো দেশ ভাগের পর ভারত গণ পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান রচনা করতে সক্ষম হলেও জিন্নাহ তা করতে সক্ষম হয়নি। না হওয়ার কারণ আমরা বুঝতে পারি ৫৪-৫৬ সালে। নির্বাচন দিলে তো দরিদ্র বাংগালী কৃষক নেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়া যাইবো। ফলে পশ্চিমের আশরাফ মুসলিমদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যাবে!! পরবর্তীতে এই গণপরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই ১৯৭১ এ বাংলাদেশের জন্ম হয়। বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে স্বাধীন হলেও হিন্দু জমিদারদের মত পূর্ব পাকিস্তানকে তারা অচ্ছুতই মনে করতো।
সম্প্রতি আমাদেরকে অনেক ইউটিউবার অনেক দারুণ সব আশ্চর্যজনক তথ্য দিয়ে যাচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে। অথচ, আবুল মনসুর আহমেদ বলছেন, আমি যখন কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তখন একটা অদ্ভুত লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের খোঁজ পাই। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ দেয়া অর্থের ব্যাপারে অভিযোগ ছিল পূর্ব পাকিস্তান সে অর্থ ব্যয় করতে পারে না। পরে ব্যাপারটি ক্ষতিয়ে দেখলাম দুটি কারণে এইটা হয়। প্রথমত, বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের অনুমতি নিতে হতো কেন্দ্র থেকে যা পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে এই ফাইলের অনুমতি পেতে পেতে অর্থ বছর শেষ হয়ে যায় এবং পূর্ব পাকিস্তান তার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের কোন সুযোগই পেত না। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান বৃষ্টি বহুল দেশ হওয়ায় এখানের সাথে পাকিস্তানের অর্থ বছর হিসাবও মিলত না। পরবর্তীতে আমি(মনসুর) দুটি সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেই এবং পূর্ব পাকিস্তানের অর্থ বছর জুন-জুলাই থেকে শুরু করি।
বৈদেশিক ট্রেনিংয়ে কিভাবে পূর্ব পাকিস্তানিদের ঠকানো হইতো তাও এই কিংবদন্তী আমাদেরকে জানিয়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তান আমাদেরকে যে অচ্ছুত ও নিম্ন বর্গ মনে করতো তার সবচাইতে বড় উদাহরণ হইলো ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান ও ৭০ এর নির্বাচন। এই সময়কার রাজনৈতিক টারময়েল আমাদেরকে তা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে সহযোগিতা করে।
ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ফলে এ অঞ্চলের মানুষ পুনরায় জেগে উঠে তার রুহানিয়াতের ভাষ্য। কিন্তু ৭১ এর মার্চে আমরা পাকিস্তানী বাহিনীর নির্মমতায় স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে যাই। সাধারণ মানুষদের উপর চলে অকথ্য নির্যাতন। রাতের অন্ধকারে জুলুমের চূড়া অতিক্রম করে দিগ্বিদিক আর্তনাদে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। আবুল মনসুর বলেন, প্রথম তিন মাস চলে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা, দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হয় প্রতিরোধ এবং তৃতীয় পর্যায়ে শুরু হয় যুদ্ধ। পরবর্তীতে ভারতের বাহিনী নামার তিনদিনের মধ্য শেষ হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। ভারত যেভাবে দাবি করে এবং প্রমাণ করতে চায় এই যুদ্ধ ছিল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এটা এই কারণে হাস্যকর যে, কোন যুদ্ধই তিনদিনের মধ্য শেষ হয় না। এই যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং মুসলিমলীগ সহ আরো কিছু দল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও গোলাম আজম ৮০’র দশকে পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে যেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি না দেয়া হয়। এ যাত্রায় আরো অনেকেই ছিলেন তবে যেহেতু পরবর্তীতে গোলাম আজম রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নামে আবার রাজনীতি শুরু করেন তখন তার ব্যাপারে প্রশ্ন উঠা শুরু হয়।
১৯৭১ এর ডিসেম্বরে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পাই। কিন্তু স্বাধীনতাকে কিছু লোক এমনভাবে উদযাপন করা শুরু করে যে জনসাধারণের উপর আবার বৈষম্য নেমে আসে। হত্যা-গুম-ক্ষুধা আর দুর্ভিক্ষ আমাদেরকে পর্যুদস্ত করে ফেলে। শেখ মুজিব নিজেই বলতে বাধ্য হয়; সবাই পায় সোনার খনি আর আমি পাইছি চোরের খনি। যদিও এই চোর তারই মন্ত্রী ছিল। অন্যায়ভাবে সিরাজ শিকদারকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয় বাহিনী দিয়ে। সেই হত্যাকাণ্ডের পর জাতির শুনতে হয় দম্ভোক্তি “ আজ সিরাজ শিকদার কোথায়?”। আয়োজন করা হয় নির্বাচনের কিন্তু মাওলানা ভাসানীকে করে রাখা হয় গৃহবন্দী। তৈরি করা হয় বাকশাল। যার মাধ্যমে নিপীড়ন চালানো হতো সাধারণ মানুষ ও ভিন্নমতালম্বী রাজনৈতিক কর্মীদের উপর। এটা ছিল স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ!!! যেখানে মানুষের জন্মই যেন হয়েছে অপমৃত্যুর জন্য। ফলাফল হিসেবে আসে ৭৫ এর ১৫ ই আগস্ট। আগস্ট মাসই যেন আমাদের মুক্তির মাস। পরবর্তীতে সিপাহী-জনতার বিপ্লব আকারে বাংলাদেশের মানুষ এগিয়ে যায় মেজর জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। জিয়াকেও আমরা হারাই এক সামরিক ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে। জাতি ডুবতে থাকে এক অতলাচক্রে। দেশ স্বাধীনের ৫৪ বছরের ইতিহাসে জাতীয় অগ্রগতির স্বাদ চাখায় একমাত্র জিয়াউর রহমান যে সুযোগ ছিল মুজিবের হাতে সবচাইতে বেশি। এজন্য অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আমাদেরকে আক্ষেপ করে বলেছেন, শেখ মুজিবকে ইতিহাস সুযোগ দিয়েছিল গ্রেট লিডার হওয়ার কিন্তু সে হইতে পারে নাই।
বাংলাদেশের মানুষ যে রাজনৈতিক অতলাচক্রে ডুবছিল তার শেষটা দেখিয়েছে আমাদেরকে শেখের বেটি হাসিনা। শেখ মুজিব যা করতে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হইছিলো হাসিনা ঠিক তা করতে গিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। তার বাবার দম্ভোক্তি ছিল আজ সিরাজ শিকদার কোথায় আর হাসিনার দম্ভোক্তি ছিল হাসিনা পালায় না। কিন্তু ইতিহাস আমাদেরকে বলে দম্ভোক্তি বড় নিষ্ঠুর এবং সে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। মুজিব এবং হাসিনার বেলার সেই নিষ্ঠুর প্রতিধ্বনি তাদের উপর বাস্তবায়িত হয়েছিল।
হাসিনার ফ্যাসিসম অসংখ্য সাধারণ মানুষের হাত-পা-চোখ আর প্রাণবায়ু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু মানুষের রুহানিয়্যাত জেগে উঠলে তাকে পৃথিবীর কোন শক্তির থামানোর যে জো নেই তা ২৪ শের জুলাই আমাদেরকে আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ২৪ শের প্রায় সকল শহিদ দরিদ্র মুসলিম। যারা আমাদেরকে ৪৭ এ স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, যারা এনেছিল ৭১ এ স্বাধীন দেশ আর আবার ২৪ সে তারাই আমাদেরকে মুক্ত করেছে ফ্যাসিস্ট জালেমশাহী হাসিনার অন্যায় আর খুনের মহড়া থেকে। কিন্তু অবাক হতে হয় সেই দরিদ্র মুসলিম রুহানী সত্তা যেন বার বার পরাজিতই হয়ে যাচ্ছে।
এবার সময় এসেছে সকল পরাজয় আর গ্লানি মুছে ভারতীয় আধিপত্যবাদী বন্ধুত্বের খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে গিয়াস উদ্দীন আজম শাহের মত পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের মত নিজেদের স্বকীয়তা আর স্বরাজ কায়েমের। তারুণ্যর বাংলাদেশে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সাহসী আর বলিষ্ঠ চিত্তে আমরা আজকে বলতে পারি দরিদ্র মুসলিমের বঙ্গে সবাই আজ মুক্ত বিহঙ্গের মতো সকলকে আজাদী দিবসের শুভেচ্ছা।
বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) রাজধানীর বিজয়নগরস্থ ক্যারিয়ার লিফট মিলনায়তনে সমন্বয় প্রকাশন কর্তৃক আয়োজিত আলোচনা সভায় এই প্রবন্ধ পঠিত হয়।
[১] আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ-১২৪
[২] আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ-১২৫
[৩] আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ-১২৫
[৪] বাংলা ভাগ হলো, পৃ-১৯৫
[৫] বাংলা ভাগ হলো, পৃ-১৯৫
[৬] আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ-১২৯
লেখক : গবেষক





লেখক ঐতিহাসিক সত্যের নির্মোহ মূল্যায়ন করেছেন। এজন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য। আমাদের ইতিহাস চর্চায় আরও গতি আনা উচিত। কঠিন সত্য প্রকাশ করতে, ঘটনার বিবরণ ও মূল্যায়নে সাহসী হতে হবে। কিন্তু সত্য হচ্ছে, অবিবেচক দলবাজির কারণে লেখকেরাও ভীত।