বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান দলীয় শোকজ নোটিশের জবাব দিয়েছেন। মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর কাছে লিখিত জবাব দেন তিনি।
ফজলুর রহমান তার লিখিত জবাবে শুরুতেই বলেন, “আমার সালাম ও শুভেচ্ছা নিবেন। বিগত ২৪ আগস্ট রাত ৯টার দিকে আপনার স্বাক্ষরিত কারণ দর্শানোর নোটিশ হাতে পেয়েছি। এরপর সময় বৃদ্ধির আবেদন করলে আপনি আমাকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন, এজন্য ধন্যবাদ। যেহেতু নোটিশে একত্রে সবকিছুর জবাব চাওয়া হয়েছে, তাই আমি সব অভিযোগের উত্তর একত্রে দিচ্ছি।”
শোকজে উত্থাপিত অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন। “আমি কোনো দিন কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিইনি, যা আমার স্বভাব ও চরিত্রের বিপরীত। বরং আমি প্রথম থেকেই শহীদদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছি। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শহীদ আবু সাইদকে পুলিশ গুলি করে হত্যার পরই আমি বলেছিলাম—সে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম বীরশ্রেষ্ঠ।”
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই আমি ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহ-রাসুলে বিশ্বাসী ব্যক্তি। তবে রাজনৈতিকভাবে ধর্মব্যবসায়ীদের, বিশেষত জামায়াত ইসলামী, সব সময় সমালোচনা করেছি, ভবিষ্যতেও করব।”
কোটাবিরোধী আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, “এই আন্দোলন প্রথমে নির্দলীয় চরিত্রের ছিল। আমি ইউটিউবের মাধ্যমে তাদের উৎসাহ দিয়েছিলাম—‘বাবারা, তোমরা শুধু চাকরি চাইছ কেন? তোমরা গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন কর।’ এরপর জুলাই আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুক্ত থেকেছি।”
ফজলুর রহমান বলেন, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি ঘোষিত মহাসমাবেশে সরকার ভয়াবহ দমন–পীড়ন চালায়। তখন হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে ছিলেন। “সে সময় আমি প্রতিদিন অনলাইনে ও টেলিভিশন টকশোতে বক্তব্য দিয়ে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেছি। জাতির সামনে আশার আলো জাগিয়ে রেখেছি।”
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট আন্দোলনের বিজয়ে শেখ হাসিনা ও তাঁর ফ্যাসিস্ট শক্তি পালিয়ে যায়। কিন্তু এর কিছুদিন পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা সারজিস আলম প্রকাশ্যে দাবি করেন জামায়াত-শিবিরই জুলাই আন্দোলনের ভ্যানগার্ড। “তখন থেকেই আমি প্রতিবাদ করে আসছি। আমি বলেছি, বিএনপি আন্দোলনের জমি তৈরি করেছে, বীজ বপন করেছে, পানি-সার দিয়েছে, কিন্তু ধান কাটার সময় ছাত্র আন্দোলনের কিছু নেতা সেই ফসল কেটে নিয়েছে। এ দাবিটি অনৈতিক।”
তিনি অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে জামায়াত-শিবির মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে মাঠে নামে। তারা বলে ১৯৪৭ হলো প্রথম স্বাধীনতা, ২০২৪ হলো দ্বিতীয় স্বাধীনতা, আর ১৯৭১ নাকি ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া। “একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি এ কথা শুনে মনে করেছি—এর আগে আমার মৃত্যু হওয়াই ভালো ছিল। তাই আমি জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সত্য কথা বলে আসছি। জামায়াত-শিবিরকে ‘কালো শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছি, আর এনসিপিকে তাদের সহযোগী বলেছি।”
তিনি বলেন, মানুষ এখন বুঝতে পারছে জুলাই আন্দোলনের দুটি রূপ ছিল—একদিকে বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতৃত্বে গণআন্দোলন, অন্যদিকে জামায়াত-শিবিরের ষড়যন্ত্র। “আমার দল বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল। তাঁর স্মৃতি স্মরণ করেই আমি অপশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলা ও প্রতিবাদ করাকে আমার পবিত্র দায়িত্ব মনে করি।”
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ফজলুর রহমান আরও বলেন, “গত ছয় মাসে আমি শত শত বক্তব্য দিয়েছি। এর মধ্যে দু-একটিতে ভুল থাকতে পারে। তবে আমার কোনো বক্তব্যে যদি দলের ক্ষতি হয়ে থাকে, আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। আমার প্রিয় দল বিএনপির কোনো ক্ষতি আমি কখনো করিনি, করবও না। দলের নেতৃত্বের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। সুবিচার পাব বলে আশা করি এবং দলের বৃহত্তর স্বার্থে যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রতি সর্বদাই অনুগত থাকব।”




