ইরানের ওপর চলমান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ–এর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ২ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এর আগে গত জানুয়ারিতে জাতিসংঘের অর্থনীতিবিদেরা ২০২৬ সালের জন্য ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পরবর্তী বছরের জন্য ২ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আর্থিক বাজারের অস্থিরতাকে এই পূর্বাভাস কমানোর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক বিভাগ।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ শাখার পরিচালক শান্তনু মুখার্জি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর এটি প্রথমে “জ্বালানি বাজারের জন্য একটি বড় ধাক্কা” হিসেবে দেখা দিয়েছিল। তবে বর্তমানে এটি একটি ব্যাপক সরবরাহ সংকটে পরিণত হয়েছে; যার পরিধি, মাত্রা ও স্থায়িত্ব অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে।
শান্তনু জানান, এই পূর্বাভাসে ধরে নেওয়া হয়েছে যে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে তেলের দাম কমতে শুরু করবে এবং সরকারগুলো জরুরি জ্বালানি রিজার্ভ ব্যবহারের মাধ্যমে এই ধাক্কা কিছুটা সামাল দিতে সক্ষম হবে।
তবে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এমনটি হলে তা হবে চলতি শতাব্দীতে কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০০৭-২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের বাইরে অন্যতম সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির রেকর্ড।
সংবাদ সম্মেলনে শান্তনু বলেন, “আমাদের বর্তমান পরিসংখ্যানগুলো বড় ধরনের অনিশ্চয়তাসহ আসছে। আর এই অনিশ্চয়তা নিজেই অর্থনীতির গতিরোধের একটি বড় কারণ।”
তিনি আরও বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহামারি-পূর্ববর্তী গড় হারের তুলনায় চলতি বছর এসব দেশের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কম হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে; যেখানে সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই পতনের হার ০ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।
২০২৬ সালে বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় পশ্চিম এশিয়ায় সবচেয়ে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা দেখা যেতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘ। এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ক্যারিবীয় অঞ্চল, পশ্চিম আফ্রিকা, মধ্য আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্য–এর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস চলতি বছরের জন্য ০ দশমিক ৪ থেকে ০ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে।
তবে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীন–এর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। দেশ দুটির প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ২ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
স্থবির হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক প্রভাব
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও, হরমুজ প্রণালিতে ইরানি হামলার আশঙ্কায় নৌযান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।
সামুদ্রিক বাণিজ্যবিষয়ক তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘উইন্ডওয়ার্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার মাত্র ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত।
জাতিসংঘের আগে গত এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করেছিল।




