মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে পৌঁছানোর প্রেক্ষাপটে এবার প্রকাশ্যে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তা রুশ সংবাদমাধ্যম আরআইএ নভোস্তি-কে বলেছেন, ‘এবার আমরা আর সংযত আচরণ করব না।’ তাঁর দাবি, ইরানের হাতে এমন কিছু অত্যাধুনিক দেশীয় অস্ত্র রয়েছে, যেগুলো এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারই করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ বলছে, তেহরান এখন শুধু প্রচলিত সামরিক প্রতিরক্ষা নয়, বরং বহুস্তরীয় পাল্টা হামলার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র, আত্মঘাতী ড্রোন, মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী, সাইবার হামলা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি ‘জনযুদ্ধ’—সবকিছুর প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধকে ঘিরে আঞ্চলিক অস্থিরতা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক হুমকি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও বিস্ফোরণমুখী হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, ইরান ধীরে ধীরে নিজেকে একটি ‘বহুমাত্রিক যুদ্ধযন্ত্রে’ রূপান্তর করার চেষ্টা করছে।
‘গোপন অস্ত্র’ নিয়ে ইঙ্গিত
Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি) এবং ইরানের সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নিজস্ব অস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট, আন্তর্জাতিক কৌশলগত অধ্যয়ন ইনস্টিটিউট এবং কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন কেন্দ্র–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের মূল শক্তি হচ্ছে কম খরচে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অসম যুদ্ধ কৌশল।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘এখনো ব্যবহার না করা অস্ত্র’ বলতে ইরান কয়েকটি প্রযুক্তির দিকে ইঙ্গিত করছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন প্রজন্মের অতিধ্বনিগতি ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন, ইলেকট্রনিক ও সাইবার যুদ্ধ সক্ষমতা, ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা এবং ড্রোনের ঝাঁকভিত্তিক হামলা প্রযুক্তি।
২০২৩ সালে ইরান ‘ফাত্তাহ’ নামের একটি অতিধ্বনিগতি ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে। তেহরানের দাবি, এটি শব্দের গতির ১৩ থেকে ১৫ গুণ বেগে চলতে পারে এবং মাঝপথে গতিপথ পরিবর্তনেও সক্ষম। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এ দাবির সবটা নিশ্চিত না করলেও স্বীকার করেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলার পরও ইরান দ্রুতগতিতে তাদের সামরিক শিল্প ও ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেহরান আবার ব্যাপক হারে ড্রোন উৎপাদন শুরু করেছে।
অসম যুদ্ধের কৌশল
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে প্রচলিত শক্তিতে ইরান পিছিয়ে। তাই তেহরান ‘অসম যুদ্ধনীতি’র ওপর জোর দিচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে ইরানের হাতে।
যুদ্ধ শুরু হলে ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হতে পারে। একই সঙ্গে ইরাক, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে জানিয়েছে কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন কেন্দ্র।
ড্রোনের ঝাঁক
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানি ‘শাহেদ’ সিরিজের আত্মঘাতী ড্রোনের ব্যবহার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যৎ সংঘাতে ইরান একসঙ্গে শত শত ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার কৌশল নিতে পারে।
হরমুজ প্রণালি অচলের শঙ্কা
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত শুরু হলে ইরান সেখানে মাইন পেতে, ড্রোনচালিত নৌযান ব্যবহার করে কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক তেল পরিবহন ব্যাহত করতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ বলছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় করার প্রস্তুতি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাবের বড় অংশই আসে তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে। লেবাননের Hezbollah, ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া ও সিরিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে এসব গোষ্ঠী একযোগে ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থে হামলা চালাতে পারে। এতে যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সাধারণ মানুষকেও প্রস্তুত করা হচ্ছে
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান শুধু অস্ত্রভাণ্ডার নয়, সাধারণ নাগরিকদেরও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে আইআরজিসির অধীন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ‘বাসিজ মিলিশিয়া’ বিভিন্ন শহরে তরুণদের অস্ত্রচালনা, নগর প্রতিরক্ষা, ড্রোন শনাক্তকরণ ও জরুরি উদ্ধারকাজের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স, মিডল ইস্ট আই ও আল জাজিরা।
বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তান, ইরাক ও ভিয়েতনামের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান ‘জনযুদ্ধ’ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ কৌশলকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’
ইরানের আলোচিত সামরিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কথিত ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’। এটি ভূগর্ভস্থ বিশাল সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও চলমান উৎক্ষেপণযান মজুত রাখা হয়।
ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রকাশিত ভিডিওতে পাহাড়ের গভীরে সারিবদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণযানের দৃশ্য দেখা গেছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, এসব ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ইরানের কৌশলগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ বিমান হামলা চালিয়েও পুরো অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করা কঠিন।
সাইবার যুদ্ধেও জোর
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ সংঘাতে সাইবার হামলাও বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। অতীতে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিভিন্ন অবকাঠামোয় ইরান-সমর্থিত হ্যাকারদের হামলার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা শিল্প কারখানার সফটওয়্যারে হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে অচল করার চেষ্টা হতে পারে।
ঝুঁকিও কম নয়
তবে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক শক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ইরানের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা দেশটির অর্থনীতি ইতিমধ্যে দুর্বল। বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক অসন্তোষও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। দীর্ঘ যুদ্ধ পরিস্থিতি অভ্যন্তরীণ সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তারপরও তেহরানের বার্তা স্পষ্ট—ফের হামলা হলে সেটি শুধু সীমিত পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় শেষ হবে না; বরং গোটা অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিতে পারে।




